ব্রিটেনে কৃষি ভিসা; আবেদনের আগে যা জানা প্রয়োজন, সতর্কতা আইনজীবীদের

Share on Facebook

ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে কর্মীদের অবাধ যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং করোনাভাইরাসের পর বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় নানামুখি চাপে পড়ে ব্রিটেনের কৃষিখাত। আর তাই ব্রিটেনের কৃষিখাতের উন্নয়নে মৌসুমভিত্তিক বিভিন্ন দেশ থেকে চলতি বছর ৪৫ হাজার কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

তবে এই ভিসায় বাংলাদেশিদের ব্রিটেনে যাওয়ার সুযোগ খুবই কম হবে বলে ধারণা করছেন দেশটির আইনজীবীরা।
স্বল্প মেয়াদে কৃষি ভিসা মূলতঃ দু‘টি ভাগে দেওয়া হবে। একটি হচ্ছে ফুল, ফল ও সবজি বাগানে গাছ থেকে উত্তোলন ও বাগান রক্ষণাবেক্ষণ। এসব কাজের জন্য ভিসার মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ৬ মাস। বছরের যে কোনো সময় এই ভিসার জন্য আবেদন করা যাবে।

অন্যটি হচ্ছে হাঁস-মুরগি ও পাখি লালন পালন এবং বুচার (কসাই)। এই ভিসায় বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই তিন মাস ব্র্রিটেনে অবস্থান করা যাবে। উভয় ভিসার জন্য আবেদন ফি ২৫৯ পাউন্ড, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। আর আবেদনকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১ হাজার ২৭০ পাউন্ড (প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার টাকা) থাকতে হবে।

ইউরোপে কৃষি ভিসার উচ্চ চাহিদার ধারাবাহিকতায় ব্রিটেনের সাম্প্রতিক কৃষি ভিসার জন্য বাংলাদেশ থেকে অনেকেই উদগ্রীব হয়ে আছে। কারণ এই ভিসার জন্য ভালো ইংরেজি জানা বাধ্যবাধকতা নেই। এছাড়া খুব অল্প খরচে এই ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে। আর তাই বাংলাদেশ থেকে এক শ্রেণির এজেন্ট বা দালাল চক্র এই ভিসায় ব্রিটেনে আনার সহায়তা করতে বড় অংকের টাকা লেনদেন করছে।

তবে এই ভিসায় ব্রিটেনে যাওয়ার প্রক্রিয়া কী আর ব্রিটিশ সরকার কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে এই ভিসায় কর্মী নেওয়ার লাইসেন্স দিয়েছে তা অনেকেরই জানা নেই। কৃষি ভিসা বিষয়ে বিস্তারিত জানা না থাকার কারণে এই ভিসায় ব্রিটেনে আসতে আগ্রহীরা প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক।

ব্রিটিশ সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে কৃষি ভিসায় কর্মী আনতে মূলত ছয়টি কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছে। এই ছয়টি কোম্পানি হচ্ছে- প্রো ফোর্স, হুপস লেবার সলিউশন, আরই রিক্রুটমেন্ট, ফ্রুটফুল জবস, কনকোর্ডিয়া এবং এজি রিক্রুটমেন্ট।

প্রো ফোর্স কোম্পানির ওয়েনসাইট প্রো-ফোর্সডটকোডটইউকে ‘তে দেখা যায়, ব্রিটেনের সিজনাল ওয়ার্কার ভিসার জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের মাইগ্রেশন সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেছেন তারা। দেশগুলো হচ্ছে- ইউক্রেন, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিস্তান এবং ম্যাসিডোনিয়া।

ওয়েবসাইটে তারা এ কথাও উল্লেখ করেছে, ওই দেশগুলো ছাড়া অন্যকোনো দেশ থেকে তারা কর্মী নিয়োগ করছে না। এছাড়া তারা বলেছে ওই ভিসার জন্য প্রসেসিং ফি মাত্র ২৫৯ পাউন্ড। এই ফি ছাড়া কোনো ব্যক্তি কারো কাছে অন্যকোনো অর্থ দাবি করলে সেটা না দিতেও তারা অনুরোধ করে আদম দালাল থেকে সাবধান থাকতে বলা হয়েছে।

হুপস লেবার সলিউশন ওয়েবসাইট হুপসলেবারসলিউশনডটকম সূত্রে জানা যায়, তারা রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, মলদোভা, সার্বিয়া, ম্যাসিডোনিয়া, ইউক্রেন, কিরগিস্তান, কাজাখাস্তান, উজবেকিস্তান এবং তাজিকিস্তান থেকে ব্রিটেনে সিজনাল কৃষি ভিসায় কর্মী নিয়োগ করবে। কেউ ওইসব দেশের নাগরিক না হলে তাদের এই ভিসার জন্য আবেদন না করতে অনুরোধ করা হয়েছে।

এমনকি তারা এটাও উল্লেখ করেছে নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়া থেকে কোনো কর্মী নিয়োগ করছে না। তারা আরও জানিয়েছে তাদের কোম্পানির কোনো স্টাফ, প্রতিনিধি কোনো কর্মকর্তা এবং তাদের সরকারি কোনো পার্টনাররাও এই ভিসার জন্য কোনো ফি চাইতে পারবে না। কেউ কোনো ফি চাইলে তাদের ই-মেইলে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

ফ্রুটফুল জবসের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, তারাও রাশিয়া ও ইউক্রেনসহ পাঁচটি দেশে তাদের নিয়োগ দেওয়া এজেন্ট দ্বারা ব্রিটেনে কৃষি ভিসার আবেদন গ্রহণ করছে। তারা জানিয়েছে, ওইসব দেশ ছাড়া অন্যকোনো দেশ থেকে আপাতত কোনো আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে না কারণ, ব্রিটেন এই বছর সীমিত সংখ্যক কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে।

এছাড়া তারা এটাও জানিয়েছে, কেউ যদি এই ভিসার জন্য ফ্রুটফুল জবসের পক্ষে অর্থ দাবি করে তাহলে তাদের ই-মেইলে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

আরই রিক্রুটমেন্টের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যে জানা যায়, ব্রিটেন সরকার পোলট্রি সেক্টরে কর্মী নিয়োগে যে দু’টি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছে তাদের একটি তারা। সরকারের নিশ্চয়তার পর তারা এ বছরের ১৩ জুন থেকে আগামী দুই বছর পোলট্রি কর্মী নিয়োগ শুরু করেছে।

কনকর্ডিয়ার ওয়েবসাইট কনকর্ডিয়াভলেন্টিয়ারসডটঅর্গ এ দেখা যায়, তারা বর্তমানে শুধু সেসব দেশ থেকেই ব্রিটেনের কৃষি ভিসার জন্য আবেদন গ্রহণ করছে যেসব দেশে তাদের অনুমোদিত রিক্রুটমেন্ট এজেন্ট রয়েছে। তাদের ওয়েবসাইটে তারা এটাও উল্লেখ করেছে, নেপাল থেকে তারা কোনো আবেদন গ্রহণ করবে না। তাদের অনুমোদিত দেশ হলো- লিথুনিয়া, কাজাখাস্তান, পোল্যান্ড, লাটভিয়া, ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, কিরগিস্তান, তাজিকিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, মলদোভা, সার্বিয়া, ম্যাসিডোনিয়া, মন্টিনিগ্রো এবং দক্ষিণ আফ্রিকা।

ঐতিহ্যগতভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মীদের ওপর নির্ভর করত ব্রিটেনের কৃষি খাত। এমনকি আমদানি পণ্যের প্রতিযোগিতার মুখেও পড়েছে দেশটির কৃষিশিল্প। কৃষিকে উৎসাহিত করতে সরকার গত মে মাসে ইউকে ফার্ম টু ফর্ক সামিট আয়োজন করে।

সম্মেলন শেষে কৃষকদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বলেছেন, ‘ব্রিটিশ কৃষি এবং ব্রিটিশ পণ্য শুধু একটি চিন্তাভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমি জানি, আপনাদের মধ্যে অনেকে এমন কথা আগেও ভেবেছেন। গেলো ফেব্রুয়ারিতে নতুন প্রযুক্তির বিকাশ এবং উদ্ভাবনী কৃষিকে এগিয়ে নিতে চলতি বছর কৃষকদের জন্য ১৬৮ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অনুদান দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার।

এ বিষয়ে ইংল্যান্ডের সলিসিটর সাঈদ বাকী বলেন, এদেশে কৃষি কর্মী হিসেবে আসতে কোন দেশ থেকে এই ভিসার জন্য আবেদন করা যাবে তা কিছুটা জানা গেলেও কোন দেশগুলো থেকে শ্রমিক নেওয়া হবে তা এখনো জানা যায়নি। কৃষি ভিসায় আসতে হলে সরাসরি যুক্তরাজ্যের এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করতে হবে, যদি তারা আপনাকে বাছাই করে তবে তারা আপনাকে ভিসা আবেদন করার জন্যে সার্টিফিকেট অফ স্পনসরশিপ লেটার দেবে।

এজন্য তারা আবেদনকারীর কাছ থেকে কোনো অর্থ নেবে না। সুতরাং নানা ধরনের চটকদার বিজ্ঞাপণে বিভ্রান্ত না হয়ে সতর্কভাবে এই ভিসার আবেদন করা যেতে পারে। যে কোনো ভিসার কথা বলে অর্থ লেনদেন করা ফৌজদারি অপরাধ।

যুক্তরাজ্যের আরেকজন প্র্যাক্টিজিং সলিসিটর ইকবাল হোসাইন প্রধান এ বিষয়ে জানান, কৃষি ভিসায় ব্রিটেনে আসতে ইংরেজি জানা বাধ্যবাধকতা না থাকায় ভারতীয় উপমহাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক কর্মী বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকার মাত্র ছয়টি কোম্পানির মাধ্যমে এই ভিসায় কর্মী নিয়োগ করবে, যাদের অধিকাংশই উল্লেখ করেছে তারা ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালসহ কয়েকটি দেশ থেকে কোনো কর্মী নিয়োগ করবে না। তাই এই ভিসায় আবেদন করার আগে যুক্তরাজ্যে কর্মরত সার্টিফাইড আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন তিনি।

 

Leave a Reply