প্লাস্টিক দূষণে পৃথিবীর শ্বাসকষ্ট, পর্যটকের দায়িত্ব

Share on Facebook

বিভিন্ন দূষণে পৃথিবীর দমবন্ধ হয়ে আসছে। ধারাবাহিক প্লাস্টিক দূষণ পৃথিবীর শ্বাসকষ্টের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রথম বাণিজ্যিক প্লাস্টিক পণ্য ১৯০৭সালে উৎপাদিত হয়। তবে ১৯৫২ সাল হতে প্লাস্টিকের বাণিজ্যিক উৎপাদন বাড়তে শুরু করলেও ১৯৭০ সাল পর্যন্ত উৎপাদনের পরিমাণ খুব বেশী ছিল না।

পরবর্তী বিশ (১৯৭০- ১৯৯০) বছরে প্লাস্টিকের উৎপাদন তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। চলতি শতকের প্রথম দশকে তৈরী প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ গত চার দশকের তুলনায় বেশী। বর্তমানে বার্ষিক প্রায় ৪মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরী হচ্ছে।

উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চীনে রপ্তানির উদ্দেশ্যে প্লাস্টিক উৎপাদন করা হত। চীন ২০১৭ সালে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পন্য আমদানি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে জাতীয় সোর্ড নীতি কার্যকর করে। এই নীতির ফলে অবাধে চীনে প্লাস্টিক আমদানি নিষিদ্ধ হয়।

১৯৭০ সাল থেকে প্লাস্টিক উৎপাদনের হার অন্য যে কোন উপাদানের তুলনায় দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ  বৈশ্বিক প্লাস্টিকের উৎপাদন ১,১০০ মিলিয়ন টনে পৌছবে।

বিশ্বে প্লাস্টিক উৎপাদনে সর্বাগ্রে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বার্ষিক প্লাস্টিক উৎপাদনের পরিমাণ ৪০মিলিয়ন টনের বেশী। বার্ষিক ৮মিলিয়ন অপঁচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্য শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে  গিয়ে জমা হয়। প্লাস্টিক দূষণের কারণে পৃথিবীর সমুদ্রগুলি ক্রমাগত অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে দাবী করা হয় প্লাস্টিক বর্জ্যে আটকে বা খেয়ে প্রতি বছর কমপক্ষে ১লাখ সামুদ্রিক জীবের মৃত্যু হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের ৪০শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্যে আচ্ছাদিত হয়ে গেছে। ২০৪০ সাল নাগাদ সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণের পরিমাণ ২৯মিলিয়ন টন ছাড়িয়ে যাবে এবং আগামী দশকে সমুদ্রে মাছের তুলনায় প্লাস্টিক বেশী থাকবে।

মাছসহ সামুদ্রিক জীব ঘটনাক্রমে প্লাস্টিক বর্জ্য বা মাইক্রোপ্লাস্টিক খায়। আমাদের দেশে পোল্ট্রি ফিড, ক্যাটেল ফিড এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ছোট ছোট কণায় ভেঙে যাওয়ার ফলে প্লাস্টিক কণা মানুষের চোখে অদৃশ্য থাকলেও খাদ্য শৃঙ্খলে ঢুকে পড়ে।

২০১৯ সালে রয়টার্স ইনফোগ্রাফিক-এর তথ্য অনুসারে মানুষ প্রতি সপ্তাহে প্রায় পাঁচ গ্রাম প্লাস্টিক গ্রহণ করে যার ওজন প্রায় একটি বোতলের প্লাস্টিকের ক্যাপ বা চামুচের সমান। এক বছরে মানুষ যে পরিমাণ প্লাস্টিক গ্রহণ করে তা একটি ডিনার প্লেটের সমান।

কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাবে বিশ্ব প্রায় স্তব্দ হয়ে ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিক লক ডাউনের কারণে বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, তাপ দূষণসহ কিছু দূষণ কমলেও প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়। একবার ব্যবহার যোগ্য সার্জিক্যাল মাস্ক, পিপিই, স্যানিটাইজার, খাদ্য ও বস্ত্রের প্যাকেজিংয়ে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক গবেষণা তথ্য অনুসারে কোভিড-১৯ মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বের ১৯৩টি দেশে আনুমানিক ৮.৪ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। এই বর্জ্যের মধ্যে ২৫ হাজার ৯শ টন,  যার ‍ওজন ২হাজার ডবল ডেকার বাসেরও বেশী তা সমুদ্রে জমা হয়েছে। পৃথিবীর মানুষ নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে গিয়ে পৃথিবীর স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে. অথচ পৃথিবী সুস্থ না থাকলে মানুষের সুস্থ থাকা সম্ভব নয়।

প্লাস্টিক দূষণের অন্যতম কারণ একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য। পৃথিবীর সুস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে অপ্রয়োজনে এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহারে লাগাম টানার জোরদার চেষ্টা চলছে। পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থাসমূহ পর্যটন খাতে একক ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার সীমিত করতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

জাতিসংঘের পরিবেশ ও পর্যটন বিষয়ক সংস্থার সদস্য হিসেবে প্লাস্টিক দূষণ রোধে চলমান কার্যক্রমে বাংলাদেশ সম্পৃক্ত রয়েছে। প্লাস্টিক দূষণরোধে পর্যটকদের প্রধান ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাসমূহ।

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পানির বোতল, মাস্ক, চিরুনি, টুথব্রাশ, খাদ্য পণ্যের প্যাকেট, হোটেলে সরবরাহ করা প্লাস্টিকের ছোট টিউবের টুথপেস্ট, প্লাস্টিকের কাপ ব্যবহার না করার জন্য পর্যটকদের  নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। পর্যটকদের নিজ দায়িত্বে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্বার্থে সাগর, পাহাড় ও নদীসহ পর্যটন গন্তব্যগুলিতে যেখানে সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্য না  ফেলে যথাস্থানে ফেলার অনুরোধ করা হয়েছে।

বিশ্বের দায়িত্বশীল পর্যটন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানসমূহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে প্লাস্টিক দূষণ রোধে প্লাস্টিকের ব্যবহার সীমিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

মানুষের জন্য পৃথিবী এবং পৃথিবীর জন্য মানুষ। পৃথবীকে ঝুঁকিপূর্ণ করার পরিবর্তে পৃথিবীর সাথে মানুষের সম্পর্ক সুন্দর, সরল ও দায়িত্বপূর্ণ হোক।

.

পর্যটনিয়ার জন্য লিখেছেন আহমেদ সাঈদ, সাহিত্যিক ও এক্টিভিসট।

Leave a Reply