ঝটিকা সফরে মিঠামইন দ্বিতীয় পর্ব

Share on Facebook

হোটেল ও ডাক-বাংলোবাসী ভ্রমণ সঙ্গীগণ একে একে মিলিত হচ্ছি বাংলোর ডাইনিং রুমে। প্রকাণ্ডকায় টেবিলটার টেকনাফ সীমান্তে দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন সুমন ভাই আর তেতুলিয়া সীমান্ত আতিকা আপার দখলে দিয়ে আমরা পুরো টেবিল জুড়ে শুরু করে দিলাম খাওয়া-দাওয়া। বড় ডাইনিং টেবিলের উপর বড় বড় বোল, বড় বোলের মধ্যে আরও বড় বড় মাছের টুকরা। হাওরের টাটকা মাছ আইড়, বোয়াল, ডাল, চিংড়িভর্তা, সবজি ইত্যাদি দিয়ে গরম ভাত আমরা এমনভাবে খেয়ে নিলাম যেন এই খাওয়ার পরে দুনিয়া থেকে খাওয়া-দাওয়ার সিস্টেমটাই উধাও হয়ে যাবে।

কয়েকটা ইজিবাইক ভাড়া করে যাত্রা করলাম অষ্টগ্রামের পথে। মিঠামইন উপজেলা থেকে অষ্টগ্রাম উপজেলা যাওয়ার পথে সারাদেশের পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে একটা বড় ব্রিজ, আমাদের আজকের গন্তব্য এই ব্রিজটি। ব্রিজে যাওয়া-আসার পথে ভ্রমণ সঙ্গীদের অনেকেই বিভিন্ন কায়দা-কানুন করে ছবি তুলে ধরে রাখলেন স্মৃতি হিসেবে। তবে কিছুকিছু ছবির এঙ্গেল ও কসরত দেখে মনে হলো এখানে শুধু স্মৃতিই নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারেরও একটা হিসেবপাতি থাকতে পারে। অবশ্য ছবি তুলবেই না বা কেন! আকালের এই বাংলাদেশে এমন সুন্দর একটা রাস্তা, সেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছবি না তোলাটাও অশোভন। সুতরাং এই অনিন্দ্য সৌন্দর্যের প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ফিউশনের ছবি তুলে রাখা মানে তো বাংলাদেশের সৌন্দর্য বর্ধনের সু-সমাচার জারি রাখা।

হাওরের পাশে গ্রুপের একাংশ

দু’পাশের দৃষ্টি সীমানায় থৈথৈ পানি, মৃদুমন্দ বাতাসে ছলাৎছলাৎ। বিকেলের কনে দেখা আলোয় আরও মোহনীয় হয়েছে উঠছে ব্রিজটি। ব্রিজের উপরে মান্না ভাইসহ আমরা ক’জন অপেক্ষায় আছি গ্রুপের বাকি সদস্যদের জন্য। মান্নাভাই অবশ্য ক্যামেরার চোখে সৌন্দর্য দেখছেন। লিপু দা, প্রমিসহ আরও কয়েকজন ক্যামেরা চালাচ্ছেন বন্দুকের মতো যেন সূর্য অস্তে যাওয়ার আগেই প্রচুর ছবি তুলতে হবে!

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতোন সন্ধ্যা নেমে এলো মিঠামইন থেকে অষ্টগ্রাম যাওয়ার পথের এই ব্রিজটিতে। এখানেই একটু পর ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলতে আসবে জীবনানন্দের চিল, পৃথিবীর রঙ মুছে গেলে শুরু হবে জোনাকির ঝিলমিল। আমাদের সামনে এখন বনলতা সেনের মুখোমুখি বসিবার সুবর্ণ সুযোগ; ঠিক এমন একটা শুভ ক্ষণে লক্ষীপেঁচার ভূমিকায় আবির্ভূত বেরসিক পুলিশ। সন্ধ্যার পরের নিরাপত্তা ইস্যুতে পুলিশের অনুরোধে আমরা ফিরে এলাম শহরে। শহরের বাজার এলাকায় নিজেদের মতো করেই কিন্তু দলগতভাবে আমরা ইতিউতি ঘোরাঘুরি করছি, হাঁটাহাঁটি করছি। হাঁটতে গিয়েই আমি, প্রমি আর লিপু দা এই তিনজন গ্রুপ থেকে আলাদা হয়ে গেলাম কেমনে জানি! সম্ভবতঃ গাঢ়তর সৌন্দর্য উপভোগ করার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কিম্বা অসাবধানতা বশত আমরা দলছুট হয়ে পড়েছি। দলছুট আমরা তিনজন স্থানীয় পিঁয়াজু আর চায়ের বদলে কফির স্বাদ গ্রহণ করে বাংলোয় ফিরে দেখি কোথাও কেউ নেই।

প্রমি, আমি, লিপু দা ও মানস

সঙ্গীদের অন্বেষণে বাংলোয় ফিরে আসার একটু পরেই আকাশ থেকে নেমে আসলো কয়েক ফোঁটা বৃষ্টিজল। সাথে থাকা ছাতা মাথায় তুলে নেওয়ার পর মনে পড়লো – আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা ছিল আজ বৃষ্টি হবে। পূর্বাভাস পর্যন্ত যাওয়া লাগে কেন, আজকের সকালটাই তো ছিল বৃষ্টি বিঘ্নিত। এমনকি বৃষ্টির কথা মনে করেই তো আমরা ঢাকা থেকে প্রায় সবাই বহন করে এনেছি মিস্টার ছাতা। হাওর এলাকার মনোরম আবহাওয়ার অভিঘাতে বৃষ্টির সম্ভাবনা ভুলে গিয়ে আমরা হয়ে উঠেছি পুরোদস্তুর বকাউল্লাহ-শোনাউল্লাহ। আমাদের কাছে মহামূল্যবান ছাতার মর্যাদা যখন শূন্যের কোঠায় নেমে আসার উপক্রম তখনই হালকা একটু বৃষ্টি এসে সেই ছাতাটিকে তুলে আনলো মাথার উপরে।

দুই চার ফোঁটা বৃষ্টি অথবা অবৃষ্টির ক্ষণকাল পরে আলো আঁধারীর ঝাপসা ঠেলেঠেলে একে একে সবাই ফিরছে। শুনলাম গ্রুপের কোনো একজন সদস্য নাকি প্রায় সবাইকে একটা মিষ্টির দোকানে মিষ্টি খাইয়েছে ভরপুর। ঢাকার বাইরের স্থানীয় বাজারের মিষ্টি মানেই কড়া মিষ্টি তাই মিষ্টি খাওয়ার লোভ অথবা খেতে না পারার জ্বালা আমার পক্ষে সংবরণ করা সম্ভব হলো সহজেই। পৃথিবীর যাবতীয় মিষ্টি সম্পর্কে আমার একটা ব্যাক্তিগত অভিমত আছে, মিষ্টিকে মিষ্টি হতে হলে তা হতে হবে মিষ্টিমিষ্টি, মিষ্টি কোনভাবেই মিষ্টি হওয়া যাবে না।

তাঁরা তিনজন

রাতের খাবারের সময় হতে এখনো বাকি আছে ঢের। মধ্যবর্তী এইসময়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নানা গল্প ও স্মৃতিচারণের প্রানবন্ত আড্ডায় মেতে উঠলাম ছোটো একটা গ্রুপ ভ্রমণ সঙ্গীদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা মানসের নেতৃত্বে। যেহেতু আমাদের কিছু রুম বাংলোয় আর কিছু রুম হোটেলে তাই এই আড্ডায় সবার উপস্থিতি ছিল একরকম অসম্ভব ব্যাপার।

শাকিলা আপা

রাতের খাওয়া শেষে পরদিনের প্রোগ্রাম নিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আলোচনা করার শেষ পর্যায়ে আরেকবার বৃষ্টি এসে ঘুমের বিজ্ঞাপন দিয়ে গেল। সারাদিনের ভ্রমণ ক্লান্তি আর পেটভরে হাওরের মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ার পর আরামের ঘুমের মধ্যে দিয়ে বেজে উঠবে প্রথমদিনের সমাপনী সুর। সীমিত পরিসরে আমরা অর্থাৎ মানস, মানু, শাম্মি আপা, লিপু দা, প্রমি আর আমি আরও কিছুক্ষণ আড্ডাবাজি করার পর আত্মসমর্পণ করলাম ঘুমের কাছে। (চলবে)

 

আবু রায়হান সরকার
পর্যটনের সাবেক ছাত্র ও পর্যটন পেশাজীবি

 

প্রথম পর্বের লিংক   https://www.porjotonia.com/?p=9170

Leave a Reply

Your email address will not be published.

+ 60 = 66