মুর্শিদাবাদ পর্যটন

প্রকাশিতঃজুলাই ৮, ২০১৯ সময়ঃ ৮:২১ পূর্বাহ্ন

১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁ সুবেবাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যান। তবে তারও আগে সপ্তম শতাব্দীতে রাজা শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণ-সুবর্ণ ছিল আজকের এই মুর্শিদাবাদ। মুসলমান শাসনের সময়েও মুর্শিদাবাদ দীর্ঘদিন বাংলার রাজধানী ছিল। পরে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজধানীও ছিল ‘মুর্শিদাবাদ’। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জেলা মুর্শিদাবাদের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের মানুষের একটা সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ক আর সেখানকার পর্যটনকেন্দ্রের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ বাংলাদেশ থেকে মুর্শিদাবাদে ভ্রমণে যান। সেখানে গিয়ে জানার চেষ্টা করেন বাংলা আর বাঙালিদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রাচীনালেখ্য সম্পর্কে।

মুর্শিদাবাদে ১৭শ ও ১৮শ শতকের বিভিন্ন যে স্থাপনাগুলো কালের সাক্ষী হয়ে এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে তারমধ্যে নবাব আলীবর্দী খাঁ ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার সমাধি অন্যতম। এছাড়া আরও যেসব স্থাপনা রয়েছে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিচে আলোচনা করা হলো।

হাজার দুয়ারী প্যালেস

মুর্শিদাবাদ ভ্রমণে গেলে প্রথমেই নজর কাড়ে হাজার দুয়ারী প্যালেস। ১৮২৯ সালের ২৫ আগস্ট এই প্যালেসটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৮৩৭ সালে ব্রিটিশ স্থপতি স্যার ডানকান ম্যাকলিয়ডের নকশায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মান করা হয় ইতালীয় স্থাপত্যকলার এই প্যালেসটি। মীর জাফরের পঞ্চম বংশধর তৎকালীন নবাব হুমায়ুনের বসবাসের জন্য নির্মিত এই প্যালেসটি বহু দরজাবিশিষ্ট হওয়ায় এর নামকরণ করা হয় ‘হাজার দুয়ারী প্যালেস’। শ্রুতি আছে, এই প্যালেসে এক হাজার একটি দরজা আছে।

পরবর্তীতে হাজার দুয়ারী প্যালেস হাইকোর্ট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এটি একটি মিউজিয়াম। এই প্যালেসের প্রতিটি কক্ষের কারুকার্য অত্যন্ত মনোরম। এক তলায় অস্ত্রাগার, অফিস, কাছারী, রেকর্ড রুম ইত্যাদি আছে। অস্ত্রাগারে ২৬০০ অস্ত্র সজ্জিত আছে। দর্শনার্থীদের জন্য হাজার দুয়ারী প্যালেস সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার বন্ধ থাকে।

 

সিরাজ মদীনা

ইমামবাড়া ও হাজারদুয়ারি প্রাসাদের মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে একটি মদিনা মসজিদ এটিই সিরাজ মদীনা। মসজিদ আকৃতির এই ছোট ভবনটি মূলত হযরত মুহম্মদ (সা.) মদীনার রওজা মোবারকের অনুরূপ একটি প্রতিকৃতি। এর দরজার বেদির উত্তর থেকে দক্ষিণ চার হাত, প্রস্ত এক হাত ও গভীরতা দেড় হাত। শোনা যায়, মীরকাসিম নবাব হলে তিনি মুঙ্গেরে রাজধানী স্থাপন করেন। তখন এর ধনরত্ম তিনি মুঙ্গেরে নিয়ে যান। ছোট্ট সিরাজ মদীনা সবসময় বন্ধ থাকলেও খুলে দেওয়া হয় মহররমের দিন।

মদীনা মসজিদটি সিরাজের সময়ের স্থাপত্যশিল্পের একমাত্র নিদর্শন। কথিত আছে সিরাজের মা আমিনা বেগম প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তার পুত্র নবাব হলে মদিনার পবিত্র মাটি এনে বহুমূল্যবান রত্ন দ্বারা তিনি মসজিদ বানাবেন। মায়ের প্রতিজ্ঞা পালনেই সিরাজ নিজে এই ‘মদিনা’র জন্য কারবালা থেকে পবিত্র মাটি মাথায় করে বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। তবে, এটি কথিত। এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

৫ গম্বুজ বিশিষ্ট সিরাজ মদীনার চারপাশ হাজার দুয়ারী থেকে আলাদা করতে মাটিতে ইটের বেষ্টনী দেওয়া আছে। স্থানীয় গাইডরা সিরাজ মদীনার ইটের বেষ্টনীতে প্রবেশ করে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিমায় বলেন, এই আমি, স্বাধীন বাংলায় নবাব সিরাজের জায়গায় প্রবেশ করলাম। বেরুলেই পায়ে পরবো শিকল, হবো পরাধীন, ইংরেজদের দাস। এই সিরাজ মদীনা ছাড়া মুর্শিদাবাদে নবাব সিরাজের আর কোনো স্মৃতি নেই।

(চলবে)……