করোনাকালে পর্যটন ভাবনা – বেসরকারী খাতের করণীয়

Share on Facebook

করোনা ভাইরাসের তাণ্ডব সহসাই থামার নয়। লণ্ডভণ্ড বিশ্ব দিশেহারা। জীবনহানির পাশাপাশি রুটি-রোজগার, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরী এবং সকল প্রকার যোগাযোগ শুধু স্থবির নয় ধ্বংসপ্রাপ্ত। চলছে একদিকে বাঁচার লড়াই অন্যদিকে সবকিছু সচল রাখার লড়াই। এ লড়াইয়ে সামিল হয়েছে বাংলাদেশ অনেকটা প্রথম থেকেই। আর নাজুক শিল্প হিসেবে পর্যটন বরাবরের মত প্রথমেই হয়ে গেছে ছিন্নভিন্ন। এমনিতেই সম্ভাবনাময় এ শিল্পটি নানা কারণে আজীবন অবহেলা-অযত্নের শিকার। এর মধ্যেও যা কিছু অগ্রসর হতে পেরেছে তার প্রায় পুরোটাই হয়েছে বেসরকারী খাতের পরিশ্রমে। কেন না সরকারী কোন সাহায্য সহযোগীতা ছাড়াই শুধু শ্রম, মেধা আর ভালোবাসার উপর ভর করে তারা পর্যটনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

তাই স্বাভাবিকভাবেই পর্যটন শিল্প যখন আজ মহাবিপদে এবং অস্থিত্বের লড়াইয়ে তখন সবচেয়ে বেশি বিপদে গোটা বেসরকারী খাত। এখানকার বিশাল এক জনগোষ্ঠী যারা পর্যটন সেবা দিয়ে থাকে তাদেরও দেখার যেন কেউ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা ঘোষণায় সেবা খাত হিসেবে পর্যটনের উল্লেখ এবং অগ্রাধিকার খাতের তালিকায় চব্বিশের মধ্যে পঞ্চম স্থানে থাকার পরও এই পর্যটনকে আজ পড়তে হচ্ছে নিজের পরিচিতি সমস্যায়। অনেকে নাকি জানেইনা পর্যটনের মুল সেবা খাতগুলো যেমন একঃ যানবাহন – আকাশ, স্থল ও জলপথ যান; দুইঃ আবাসন – হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, গেষ্ট হাউস ইত্যাদি; তিনঃ খাবার ও পানীয় – রেষ্টুরেন্ট, ফুটকোর্ট, ফাষ্টফুড সপ ইত্যাদি; চারঃ বিনোদন প্রতিষ্ঠান – পার্ক, থিম পার্ক, ইনডোর এন্টারটেইনমেন্ট ইত্যাদি এবং পাচঃ ট্যুর অপারেটর ও ট্যাভেল এজেন্সি মিলে এটি কত বিশাল এক শিল্প।

এখানকার লক্ষ লক্ষ মানুষ কেউ চাকুরী হারিয়ে কিংবা কেউ ব্যবসা হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। আবার অনেকে নিজেকে কিংবা নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে গোটা বিশ্ব যত সক্রিয় আমরা ততটা নই কিংবা যেনো দিশাও খুঁজে পাচ্ছিনা। অবশ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা এবং বিশেষজ্ঞদের সাথে ব্যপাক আলোচনা করে পর্যটনের বিশ্ব মুরুব্বী ইউএনডাবলুটিও এবং ডাবলুটিটিসি বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে এবং দিচ্ছে। কারণ, এই করোনা তাণ্ডব কবে শেষ হবে তার কোন নির্দিষ্ট তারিখ নেই এবং পরিস্থিতি দিন দিন বদলাচ্ছে। তাই এসব বিশ্ব সংস্থা এবং অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে কাজে লাগিয়ে আমাদের এই বেসরকারী খাতটিকে বাঁচতে হবে, বাঁচাতে হবে। এজন্য খাত সংশ্লিষ্টদের নিজেদেরকেই যা যা করতে হবে তার মধ্যে রয়েছে –

একঃ পর্যটন সংগঠনগুলোর করণীয় –

১। পর্যটন সংগঠনগুলো বিশেষ করে টিও লাইসেন্স প্রাপ্ত সমিতিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একই প্ল্যাটফর্ম থেকে একসাথে এক কণ্ঠে কথা বলা। প্রয়োজনে এবং সম্ভব হলে টিও লাইসেন্স নেই এমন সমিতিগুলোকেও সাথে রাখা যাতে সরকারের সাথে যে কোন দেনদরবারে কাজে লাগে। মনে রাখতে হবে এই আপদকালীন সময়েই সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময়, তা না হলে কাজের কাজ কিছুই হবেনা।
২। সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলো আলাদা আলাদাভাবে নিজেদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো নিয়ে আবার একত্রে বসে সর্বজনীনতা ও গুরুত্ব বিবেচনায় অগ্রাধিকার নির্ণয় করে সেই ভিত্তিতে দাবীনামা তৈরী করে সরকারের কাছে তুলে ধরা।
৩। প্রকৃত পর্যটন কর্মী ও প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির তালিকা তৈরী করে প্রকার ভেদে সরকারী বিশেষ তহবিল থেকে ত্রাণ হিসেবে অফেরতযোগ্য নগদ সাহায্য, স্বল্প মেয়াদের জন্য সুদবিহীন পুঁজি, প্রণোদনা আকারে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য স্বল্প সুদে পুঁজি এবং স্বল্প সুদে ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ পাওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের কাছে জোরালো দাবী তুলে ধরা।
৪। সংগঠনগুলোর মধ্যে এবং নিজ নিজ সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাওয়া যাতে পরিবর্তীত পরিস্থিতির সাথে মিল রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়। এতে সমিতিগুলোর মধ্যে এবং সমিতির নিজের সদস্যদের মধ্যে যে কোন ভুল বুঝাবুঝি এড়ানো যাবে এবং সাহস সঞ্চয় হবে।
৫। সমিতিগুলো আলাদা আলাদাভাবে তাদের সদস্যদের সাথে পরামর্শক্রমে নিজস্ব উদ্যোগে অথবা সরকারী কিংবা অন্যকোন সূত্রের সাহায্য নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিষয় ভিত্তিক ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণ কর্মসূচী চালানো। এতে সদস্যদের দক্ষতা বাড়বে এবং মনোবল চাংগা থাকবে। পাশাপাশি পর্যটন কার্যক্রম শুরু হলে নতুনভাবে যেসব স্বাস্থ্যবিধি ও অন্যান্য আচরণবিধি বাধ্যতামূলক হবে সেগুলোর সাথেও তারা পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে যা নিজ নিজ পেশাগত কাজের জন্য সহায়ক হবে।
৬। নিজ নিজ সমিতির সদস্যদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা, আলোচনা চালানো, সুখ দুঃখের কথা শুনা, দিক নির্দেশনা ও পরামর্শ দেয়া এবং সম্ভাব্য যেকোন সাহায্যে-সহযোগীতায় এগিয়ে আসা।

দুইঃ পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলোর করণীয় –

১। অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিজেদের টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য হচ্ছে তাদেরকে বিদায় নিতে হবে বা তারা ঝরে পড়বে। তাই তাদের নিজেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং অনিশ্চিত সরকারী ত্রাণ বা সাহায্যের উপর নিজেদের ভাগ্য ছেড়ে দেয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই।
২। ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা নেই বা কম তারা আপাতত বিকল্প কর্মসংস্থানে যেতেই হবে। আবার যাদের টিকে থাকার কিছুটা হলেও সম্ভাবনা আছে এমন সব প্রতিষ্ঠান নিজেরা অথবা মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটি মিলে নিজেদের সহায় সম্বল একত্রিত করে কনসোর্টয়াম বা জোট আকারে টিকে থাকার চেষ্টা করা। পাশাপাশি অনিশ্চিত সরকারী সাহায্যের চেষ্টা চালানো। এক্ষেত্রে পরিস্থিতি বুঝে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সুদবিহিন পুঁজি এবং প্রণোদনা আকারে স্বল্প সুদের ঋণের জন্যও চেষ্টা চালানো যেতে পারে।
৩। মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যাদের টিকে থাকা কঠিন হবে তারা একাধিক প্রতিষ্ঠান মার্জ বা একিভূত হয়ে টিকে থেকে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। এক্ষেত্রে নিজেদের সব সহায় সম্পদ একেবারে একিভূ্ত করার পাশাপাশি নতুন করে কার্যক্রম শুরুর সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারে। তার সাথে অবস্থান বিবেচনায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সুদবিহিন পুঁজি কিংবা প্রণোদনা আকারে স্বল্প সুদের ঋণ প্রাপ্তি এমনকি ব্যাংক ঋণের চিন্তাও করতে পারে।
৪। মাঝারি আকারের টিকে থাকা প্রতিষ্ঠান ও বৃহদাকারের প্রতিষ্ঠানগুলো অবস্থাভেদে এবং প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ের সুদবিহীন পুঁজি অথবা প্রণোদনা আকারে স্বল্প সুদের ঋণ কিংবা সরাসরি ব্যংক ঋণের যে কোনটি নিতে পারে। তবে, তাদের জন্য উচিৎ হবে খরচ কমানো কিংবা টিকে থাকার অজুহাতে ঢালাও কর্মী ছাটাই পরিহার করে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে দক্ষ ও প্রয়োজনীয়দের যথা সম্ভব ধরে রাখার নীতি অবলম্বন করা।
৫। সব ধরণের প্রতিষ্ঠানকেই মনে রাখতে হবে প্রতিষ্ঠান রক্ষার পাশাপাশি যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকুরীতে রাখা সম্ভব হবেনা তাদেরকে যথটা সম্ভব নিজেদের স্বার্থেই সাথে রাখার চেষ্টা চালানো। যাতে পরবর্তীতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকবলের সমস্যায় পড়তে না হয়। এজন্য পরিবেশ পরিস্থিতি ও সঙ্গতি বিবেচনায় যা যা করা যায় তার মধ্যে রয়েছে – আর্থিক, খাবার, থাকার এবং চিকিৎসার মত সুবিধাদি প্রদান; প্রস্তুতি ও স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান; মানসিক সমর্থন যোগানো ও ভিডিও প্রদর্শন এবং বিকল্প চাকুরী প্রাপ্তিতে সহায়তা দেয়া ইত্যাদি।
৬। যেসব প্রতিষ্ঠান সক্ষম যেমন হোটেল, রিসোর্ট, রেষ্টুরেন্ট ও পর্যটক যান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি কর্তৃক বিনামূল্যে হোটেল কক্ষ, খাবার ও যানবাহন দিয়ে দুর্যোগকালীন সহায়তা দেয়া।

তিনঃ পর্যটন কর্মীদের করণীয় –

১। পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত এবং অদক্ষ এমন পর্যটন কর্মীদের আপাতত বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেছে এবং তারা ইতোমধ্যে ঝরে পড়ে গেছে। তাই তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজে নিজে বাঁচার চেষ্টা করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই।
২। দক্ষ ও অভিজ্ঞ পর্যটন কর্মীদের মধ্যে যারা চাকুরী হারাবেন তারা আপাতত বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে, স্বীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারী ত্রাণের চেষ্টা করে এবং যৌথভাবে “সংহতি দল” গঠন করে একে অন্যে সাহায্য-সহযোগীতা দিয়ে এই আপদকালীন সময় পার করার চেষ্টা চালাতে পারেন। কারণ, অবস্থা স্বাভাবিক হলে যেখানেই হোক অনেকটা নিশ্চিতভাবেই তারা আবার তাদের নিজ নিজ কাজে ফিরার সুযোগ পেয়ে যাবেন।
৩। দক্ষ ও অভিজ্ঞ পর্যটন কর্মীদের মধ্যে যারা চাকুরী হারানোর ঝুঁকির মধ্যে পরবেন বা পরেছেন তারা স্বীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে আংশিক বেতন ছাড় অথবা নগদ অর্থ সাহায্য প্রাপ্তি কিংবা অন্যান্য সম্ভাব্য সাহায্য সহযোগীতা প্রাপ্তি যেমন স্বীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারী ত্রাণের চেষ্টা করা সাপেক্ষে প্রতিষ্ঠানের সাথে শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্ঠা চালাতে পারেন।
৪। সর্বস্তরের পর্যটন কর্মীদের মনে রাখতে হবে সবার সমস্যা এক নয়, তাই সমাধানের পথও এক নয়। যেজন্য এই শিল্পের সাথে নিজের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা এবং নিজের পেশাকে ধরে রাখার স্বার্থে সাময়িক হলেও হয়তো অনেক ছাড় এবং ত্যাগকে মেনে নিতে হবে। পাশাপাশি সাহস ও মনোবল অটুট রেখে এই অপ্রত্যাশিত দুর্যোগকে মোকাবেলা করতে হবে। ইনশাল্লাহ সবকিছু স্বাভাবিক হবে তবে, সময়ের ব্যবধানে।

পরিশেষে বলা যায় এই শিল্প সম্পৃক্ত সর্বস্তরের পর্যটন কর্মী, পর্যটন প্রতিষ্ঠানের মালিক ও বিনিয়োগকারী সবার মধ্যে ঐক্য ও সহমর্মীতা এবং সাহস ও ধৈর্য্য বজায় রাখতে হবে। এতে যে কোন ন্যায্য দাবী আদায় এবং বিপদ মোকাবেলা সহজ হবে। তার সাথে করোনাকালীন বিপদ মোকাবেলার জন্য ইউএনডাবলুটিও এবং ডাবলুটিটিসি কর্তৃক বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরী পরামর্শগুলোর নিরিখে আমাদের বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে চিহ্নিত উপরোল্লিখিত এই পরামর্শগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানো যেতে পারে। উল্লেখ্য, সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এই আপদকালীন সময়ে কি ভুমিকা রাখতে পারে বা রাখা উচিৎ তাও পর্যায়ক্রমে আলাচনায় আনা হবে।

মো. জামিউল আহমেদ
পর্যটন বিশেষজ্ঞ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

2 + 7 =