পর্যটন শিল্পটাকে আমি ‘মাস্তান শিল্প’ নামে ডাকি

Share on Facebook

পর্যটন শিল্প যে তার পরিধি বিশাল হতে বিশালতর করার পথে নীরবে হেটে চলেছে এর পেছনে রয়েছে কয়েকজন পর্যটন ও পর্যটনশিল্পমনস্ক মানুষের অবদান। জামিউল আহমেদ এমনই একজন পর্যটন ব্যক্তিত্ব। পর্যটনকে কেন্দ্র করেই কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের চার দশক। জনাব জামিউল আহমেদ বর্তমানে বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তার মূল পরিচয় হলো তিনি বাংলাদেশের পর্যটন বিষয়ক প্রধানতম লেখক ও গবেষক। এছাড়া তিনি বেসরকারি সফল উদ্যোক্তা, সংগঠক এবং পরামর্শক।

পর্যটনের চলমান চালচিত্র ও সম্ভাবনা নিয়ে জনাব জামিউল আহমেদের সাথে কথা বলেছেন পর্যটনিয়ার সম্পাদক আবু রায়হান সরকার। (তৃতীয় পর্ব)

পর্যটনিয়াঃ  আমরা কি তবে গণ পর্যটন নিরুৎসাহিত করবো? 

জামিউলঃ এককথায় বলতে গেলে আমাদের ডেসটিনেশনগুলো রক্ষা করার জন্য মাস ট্যুরিজম এভয়েড করতে হবে বা গণ পর্যটন এড়িয়ে চলতে হবে। কথাটা সুক্ষভাবে খেয়াল না করলে ভুল মিনিং হতে পারে। আমরা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পর্যটনকে অবশ্যই উৎসাহিত করবো কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যাতে পর্যটন কর্মকান্ডের চাপে যেনো কোনো ট্যুরিস্ট ডেসটিনেশন ধ্বংস হয়ে না যায়। তাই যে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে তা হলো বিশেষকরে তিন ধরণের পর্যটন বা ট্যুরিজম যেমন ইকো ট্যুরিজম, সাসটেইনেবল ট্যুরিজম এবং রেসপনসিবল ট্যুরিজম চর্চা নিশ্চিত করতে হবে যা কিনা একটি ট্যুরিস্ট ডেসটিনেশনকে ধ্বংসের হাত হতে  রক্ষা করতে পারে।

পর্যটনিয়াঃ তাহলে একটা কথা পরিষ্কার যে, পর্যটন শিল্প অন্যান্য শিল্পের চেয়ে একদম আলাদা?

জামিউলঃ হ্যাঁ, অবশ্যই আলাদা। কেন না অন্যান্য শিল্পের চেয়ে পর্যটন শিল্পের ভালো বা মন্দ দুটো প্রভাবই বেশি। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই শিল্পের অবদানও অনেক অনেক বেশি। আবার অন্যান্য শিল্পে ভোক্তাকে পণ্যের কাছে নিয়ে আসতে হয়না কিন্তু একমাত্র পর্যটন শিল্পেই ভোক্তাকে পর্যটন পণ্যের কাছে নিয়ে আসতে হয়। তাই এসব কারণে পর্যটন শিল্পটাকে আমি ‘মাস্তান শিল্প’ নামে ডাকি বা অভিহিত করে থাকি।

পর্যটনিয়াঃ মাস্তান শিল্প? 

জামিউলঃ হ্যাঁ, মাস্তান শিল্প। কারণ পর্যটন শিল্প বাকি সব শিল্পের উপরে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। বিশ্বজুড়ে একমাত্র পর্যটন শিল্পেই সর্বাধিক লোকের কর্ম সংস্থান হয়। আবার গরিবী হটাও আন্দোলন (পোভার্টি রিডাকশন মুভমেন্ট) সফল করার দ্রুত ও কার্যকর মাধ্যমও হলো এই পর্যটন। এক সংস্কৃতির সাথে অন্য সংস্কৃতির যে জানাশোনা বা চেনাজানা সেটাও এই পর্যটনের মাধ্যেই সবচেয়ে বেশি সম্পন্ন হয়। যখন কোনো পর্যটক কোনো পর্যটন গন্তব্যে যায় তখন সে নানাভাবে পয়সা খরচ করতেই থাকে। শুধু শপিং, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, লোকাল ট্রান্সপোর্ট বিল পরিশোধেই তার ব্যয় শেষ হয় না, ফুটপাতে এককাপ চা খাওয়া কিংবা রিকশা রাইড অথবা সুভেন্যির কেনার মত অন্যান্য ব্যয়ও আছে। পর্যটকের এই পয়সা খরচ সবরকম ভাবেই স্থানীয় অর্থনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। পর্যটন শিল্প গড়ে উঠলে সেই এলাকার রাস্তাঘাট ভালো হয়ে যায়, নতুন নতুন অবকাঠামো গড়ে ওঠে, হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউজ গড়ে ওঠে, রেস্টুরেন্ট গড়ে ওঠে এভাবে হাজার উপায়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী উপকৃত হতে থাকে। স্থানীয় অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয় ফলত জীবন যাত্রার মানও বাড়ে। পর্যটন শিল্প ছাড়া অন্যকোনো শিল্পের মাধ্যমেই যেহেতু এরকম সরাসরি ব্যাপকভাবে উন্নয়নের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না তাই পর্যটন শিল্প আসলে একটা মাস্তান শিল্পই।

পর্যটনিয়াঃ পর্যটনকে আপনি প্রায়শই রপ্তানিযোগ্য পণ্য বলে থাকেন। এ নিয়ে অনেক সাধারণ মানুষের ধারণা পরিষ্কার নয়। এ বিষয়ে একটু বিস্তারিত বলুন –

জামিউলঃ এখানে সাধারণ মানুষের এমনকি একজন পর্যটকেরও প্রসঙ্গ তুলে লাভ নাই। কারণ পর্যটনের পণ্য কী সেটা সাধারণ মানুষের বা একজন পর্যটকের না জানলেও তেমন কোনো ক্ষতি নাই। পর্যটকের যখন যে সেবা দরকার তা পেলেই তার চলবে। কোনটা পণ্য আর কোনটা পণ্য নয় সেটা নিয়ে তার মাথাব্যাথা থাকার কথাও নয় দরকারও নেই। কিন্তু যারা পর্যটন বিষয়ক একাডেমিশিয়ান, সার্ভিস প্রোভাইডার এবং নীতি নির্ধারক তাদের অবশ্যই জানা দরকার পর্যটনের পণ্যটা কী? আমি নাম বলবো না একজন প্রভাবশালী অধ্যাপক আছেন যিনি ছাত্রছাত্রীদেরকে পর্যটন পড়ান তিনিও ভালোভাবে জানেন না আসলে পর্যটনের পণ্য কী। আবার অনেকেই যেমনটা বলে থাকেন যে, কক্সবাজারই একটা পণ্য। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে কক্সবাজার নিজে কোন পণ্য নয়। ডেসটিনেশন ইটসেলফ ইজ নট এ প্রোডাক্ট। উই ডোন্ট সেল কক্সবাজার, উই জাস্ট শো কক্সবাজার টু সেল দ্যা একটিভিটিজ এন্ড সার্ভিসেস অব দ্যা ডেসটিনেশন কক্সবাজার। সো, কক্সবাজার ইজ সিম্পলি এ ডেসটিনেশন নট এ প্রোডাক্ট। প্রোডাক্ট ইজ দ্যা একটিভিটিজ এন্ড সার্ভিসেস অব এ ডেসটিনেশন।

পর্যটনিয়াঃ তাহলে পর্যটন কিভাবে রপ্তানিযোগ্য হলো?

জামিউল: রপ্তানির সংজ্ঞায় বলা আছে যে, কোনো পণ্য বা সেবা যা বিক্রি করার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যায় তাই রপ্তানি পণ্য। তাহলে আমরা দেশের ভেতরে থেকেই বিদেশি পর্যটকদের কাছে আমাদের যে সব পর্যটন সেবা বা পণ্য বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছি তাই হলো রপ্তানিযোগ্য পণ্য বা সেবা।

পর্যটনিয়াঃ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমরা আমাদের পর্যটনকে কতখানি রপ্তানিমুখী করতে পেরেছি? 

জামিউলঃ এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয়ার আগে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, আমরা আগেই বলেছি অন্যান্য শিল্পের পণ্য বিক্রয় করার জন্য পণ্যটা ভোক্তার কাছে নিয়ে যেতে হয় অথবা পৌঁছে দিতে হয়। কিন্তু পর্যটন শিল্পের পণ্যের ক্ষেত্রেই তা একমাত্র ব্যাতিক্রম। এখানে পণ্যের কাছে ভোক্তাকেই চলে আসতে হয়। এখন ভোক্তা তো আর এমনি এমনি চলে আসবে না। ভোক্তাকে আকৃষ্ট করার জন্য ভোক্তার কাছে পণ্য নয় পণ্যের তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। পর্যটনের পণ্য যেহেতু নন-ট্রান্সফারেবল সেহেতু তার তথ্যগুলো আকর্ষণীয় করে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এখানে ভোক্তা মানে পর্যটক। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের প্রোডাক্ট মার্কেটিং করতে পেরেছে তাই তারা সফল। আমরা আমাদের মার্কেটিং ঠিকমতো করতে পারি নাই তাই আমরা সফল হতে পারি নাই। আমাদের এই ব্যর্থতা যথাযতভাবে মার্কেটিং করতে না পারার ব্যর্থতা।

 

(পরবর্তী অংশ চতুর্থ ও শেষতম পর্বে)

Leave a Reply

Your email address will not be published.