প্লাস্টিকমুক্ত পর্যটনের অভিযানে ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ

সেন্টমার্টিনের ৫৫৫ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার করলেন ভ্রমণপ্রেমী সংগঠন ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ।

প্রকাশিতঃঅক্টোবর ৯, ২০১৯ সময়ঃ ১০:২৩ পূর্বাহ্ন

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। প্রতিনিয়ত সেখানে সমাগম বাড়ছে পর্যটকদের। কিন্তু তাদের ফেলে আসা বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে দ্বীপের পরিবেশ। দূষণের মাত্রা এতটাই বাড়ছে যে পরিবেশের পাশাপাশি সেখানকার প্রাণ-বৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ (টিওবি) গ্রুপের ৩৯ জন ভ্রমণপ্রেমী তিন দিনে ৯৪ বস্তা প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার করলেন। এগুলোর ওজন ৫৫৫ কেজি!

পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেয়া টিওবির স্বেচ্ছাসেবীদের একাংশ-

টিওবির এই উদ্যোগ সামাজিক মাধ্যমজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। তাদের এই সেন্টমার্টিন পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ড্রিম নাইট রিসোর্ট। স্বেচ্ছাসেবীদের এতে থাকতে কোনও টাকা দেওয়া লাগেনি। শুধু নিজেদের খরচে আয়োজন করা হয়েছে খাবারের।

ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ (টিওবি)গ্রুপটির সদস্য ১০ লাখেরও বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী। বছরজুড়েই গ্রুপটির সংগঠকরা বিভিন্ন ইভেন্ট খুলে সদস্যদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলোতে ঘুরে বেড়ান।

পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেয়া টিওবির স্বেচ্ছাসেবীদের একাংশ-

এভাবে ঘুরতে ঘুরতেই গ্রুপের
সংগঠকরা খেয়াল করলেন দর্শনীয় স্থানগুলোর পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে পর্যটকদের ফেলে রাখা
প্লাস্টিক বর্জ্যে। ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি একধরনের দায়িত্ববোধ থেকে ২০১৭ সাল থেকে
তারা শুরু করলেন “রেসপন্সিবল ট্যুরিজম” বা দায়িত্বপূর্ণ পর্যটন।
দর্শনীয় পর্যটন স্থানগুলোতে ভ্রমণের পাশাপাশি সাধ্যমতো পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোই
“রেসপন্সিবল ট্যুরিজম” এর মূল উদ্দেশ্য। এই গ্রুপটিতে তাই ভ্রমণ আলোচনা
আর পরিকল্পনা ছাড়াও নিয়মিতভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। দায়িত্বশীল
ভ্রমণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গ্রুপ থেকে উৎসাহিত করা হয়।

চলছে প্লাস্টিকমুক্ত পরিবেশ গড়ার কার্যক্রম-

২০১৮ সালে টিওবি গ্রুপের ৫৫ জন
সদস্য প্রায় ১৪০ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার করেন। গত বছর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার ইচ্ছে থাকলেও ট্রলারে
জায়গা না থাকায় তাদের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। এবার আগে থেকেই ছিল বিশেষ প্রস্তুতি।

জমাকৃত প্লাস্টিকের বস্তার একাংশ-

পরিচ্ছন্নতার এই ধারাবাহিকতায় গত ৩ অক্টোবর টিওবি’র ৩৯ সদস্যের একটি দল সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে রওনা হয়। এই যাত্রার
উদ্দেশ্যই ছিল দ্বীপটি থেকে পর্যটকদের ফেলে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য সাধ্যমতো অপসারণ
করা। তারা ৩টি দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করেন। এবারের ইভেন্টের উদ্যোক্তা ছিলেন টিওবি’র অন্যতম সংগঠক (অ্যাডমিন) নিয়াজ মোর্শেদ। ৪ থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত
সেন্টমার্টিনে চলে টিওবি’র পরিচ্ছন্নতা অভিযান।

নিয়াজ বলেন, “ভ্রমণের ক্ষেত্রেও যে একজন
পর্যটকের কিছু দায়িত্ব রয়েছে সে বিষয়টি যেন মানুষ উপলব্ধি করতে পারে সেটাই আমাদের মুখ্য
চাওয়া। টিওবি যেহেতু একটি বড় প্ল্যাটফর্ম তাই এর মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির কাজটা সহজ
হবে বলে আমরা মনে করি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দেশের ভেতরে
যেখানেই ঘুরতে যাই না কেন, সেখানেই সাধ্যমতো পরিচ্ছন্নতা
অভিযান পরিচালনা করব। আর পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রথমবার গিয়েছিলাম
শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে।”

চলছে পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম-

“দ্বীপ থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাদের
সদস্যদের বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। পর্যটকরা তো চোখ বুঁজে ময়লা ফেলে যান, সেগুলো কোথায় গিয়ে পড়ছে সেদিকে খেয়াল করেন না। দেখা গেল কাঁটাযুক্ত কেয়া
গাছের মধ্যে বোতল পড়ে আছে, সেগুলো আনতে গিয়ে আমাদের অনেকেরই
হাতে কাঁটা ঢুকে গিয়েছিল। যাই হোক, প্লাস্টিকগুলো সংগ্রহ করে
আমরা আমাদের ভাড়া করা ট্রলারে করে সেগুলোকে টেকনাফের একটি দোকানে দিয়ে দিই। ৩৯টি
বস্তায় সংগ্রহ করা ময়লার ওজন ছিল ৫৫৫ কেজি”, যোগ করেন তিনি, “তবে সেটা সেন্টমার্টিনে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের পাঁচ শতাংশও হবে না।”

পরিচ্ছন্ন প্রকৃতির জন্য চাই জনসচেতনতা-

নিয়াজ মোর্শেদ আরো বলেন, “গত বছরও আমরা প্লাস্টিক অপসারণের জন্য সেন্টমার্টিনে গিয়েছিলাম। এবার সেখানে যাওয়ার কারণ ছিল সামনের পর্যটন মৌসুমকে সামনে রেখে মানুষকে সচেতন করে তোলা। যাতে আগামী ৬ মাস পর্যটন মৌসুমে ভ্রমণপিপাসুরা যতটা সম্ভব কম বর্জ্য ফেলেন। পাশাপাশি, এখন পর্যটকের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম থাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে সুবিধা হয়েছে।” তিনি বলেন, ‘আমাদের এই অভিযান দেখে যদি কেউ ব্যবহৃত পানির বোতল না ফেলে দিয়ে ফেরত আনে তাহলেই মাদের অভিযানকে সার্থক মনে করবো। বছরে দুই-একবার পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে সব বদলে যায় না। ধীরে ধীরে সবাই যদি ভাবতে শেখেন- আমার ফেলে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য কতটা হুমকি, তাহলেই একদিন ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।’
প্লাস্টিক বোতলে কোমল পানীয়, চিপস ও বিস্কুট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বর্জ্য রি-সাইকেল ও সংগ্রহ করতে তহবিল রাখতে বাধ্য হয় সেজন্য জনস্বার্থে আদালতে রিট আবেদনের জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছেন এই স্বেচ্ছাসেবীরা।

পরিচ্ছন্নতার কর্মসূচীতে কার্যরত স্বেচ্ছাসেবীরা-

ভ্রমণপিপাসুদের প্রতি
নিয়াজের পরামর্শ, প্রত্যেকে যেন সঙ্গে করে নিয়ে
যাওয়া প্লাস্টিক বোতল বা খাবারের প্যাকেটগুলোকে ফেরত নিয়ে আসেন।

এ বছরেই শ্রীমঙ্গল, কুয়াকাটা এবং সুন্দরবনে
ঐতিহ্যবাহী রাস মেলার সময় টিওবি পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে বলেও
জানান তিনি। কারণ রাসমেলায় প্রচুর পর্যটক সমাগমের কারণে বর্জ্যও ফেলা হয় অনেক বেশি
পরিমাণে।

এছাড়া, আগামী ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক পর্বত দিবসে
বান্দরবানের কেওক্রাডং পর্বত থেকে বগা লেক পর্যন্ত পর্যটকদের বহুল ব্যবহৃত
রাস্তাটিতেও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে টিওবি’র।

পরিচ্ছন্নতার কর্মসূচীতে কার্যরত স্বেচ্ছাসেবীরা-

টিওবির নিয়াজ মোর্শেদ আরও জানান, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ এবং জেলা পরিষদের উদ্যোগে কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনের বিভিন্ন জায়গায় কিছু ময়লা ফেলার বিন বসানো হয়েছে। সেগুলোর সংখ্যা পর্যাপ্ত না হলেও ভবিষ্যতে প্রশাসন আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করেন তিনি। গত বছর তাদের দেখাদেখি সেন্টমার্টিনের স্থানীয় তরুণরাও ছোট পরিসরে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে নেমেছিল।

নিজেদের ট্রলারে করে প্লাস্টিকের বস্তাগুলো নিয়ে যাচ্ছে টিওবি-

এদিকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নাত্র কথা বিবেচনা করে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের রাতযাপন নিষিদ্ধ করার কথা ভেবেছিল সরকার। এরপরই দ্বীপে পর্যটকদের উপস্থিতি বেড়ে যায়। অনেকেই বলছেন, গত চার-পাঁচ বছর মিলিয়ে যত মানুষ দেশের একমাত্র কোরাল দ্বীপে বেড়িয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পর তার চেয়ে বেশিসংখ্যক ভ্রমণপ্রেমীকে দেখা গেছে। এ কারণেই প্লাস্টিক বোতল, চিপস, বিস্কুটের প্যাকেটে ভরে গেছে দ্বীপ। যদিও পরে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের রাতে থাকতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার।