সুন্দরবন

Share on Facebook

পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের নাম সুন্দরবন। এটি বাংলাদেশের বনভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বন। ১৯৯৭সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো  সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি যা  শুধু দেশেরই নয় বিশ্বের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যগুলোর মধ্যেও অন্যতম। গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকার বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দুইজেলা উত্তর চব্বিশপরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশপরগনা জুড়ে বিস্তৃত। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। ১০,০০০বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬,০১৭বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে এবং বাকি অংশ রয়েছে ভারতের মধ্যে।

 

সুন্দরবনের নামকরণ

বাংলায় সুন্দরবন-এর অর্থ সুন্দর জঙ্গল বা সুন্দর বনভূমি। ধারণা করা হয় সুন্দরীগাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ করা হয়েছে, কারন সুন্দরীগাছ এখানে প্রচুর জন্মায়।

 

 

সুন্দরবন

বাংলাদেশের অংশ ৬,০১৭ বর্গ কি.মি. আয়তনের সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তমব-দ্বীপ, দীর্ঘতম লবণাক্ত জলাভূমি এবং জীববৈচিত্র্যেসমৃদ্ধ একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেম। এখানে ৩১৫ প্রজাতির পাখি, ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিদ্যমান, এর মধ্যে আছে ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং বাংলাদেশের জাতীয় পশু রয়েলবেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবনে বানর, কুমির, হাঙ্গর, বাঘ, হরিণ, ডলফিন, অজগর এবং বনমোরগ। এছাড়াও রয়েছে ৩ শতাধিক প্রজাতিরগাছ, ১৪ প্রজাতির সরীসৃপ, আড়াই শতাধিক প্রজাতির পাখি,  ৪২ প্রজাতির বন্যপ্রাণি ও ৩২ প্রজাতির চিংড়ি ২ শতাধিক প্রজাতির মাছ। প্রধান সরীসৃপ জাতিগুলোর মধ্যে আছে নোনাপানির কুমির, অজগর, গোখরা, গুইসাপ, সামুদ্রিক সাপ, গিরগিটি, কচ্ছপ এবং অন্যান্য। সুন্দরবনে অনেক প্রজাতির সাপ পাওয়া যায়। জলাভূমি হিসাবে রামসার এলাকার সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকায় সুন্দরবনকে ১৯৯২ সালে ৫৬০তম রামসার এলাকা হিসাবে যোষণা করা হয়েছে।

 

সুন্দরবনের বাঘ

সুন্দরবন রয়েলবেঙ্গল টাইগার বাঘের আবাসস্থল। এসব বাঘ উল্ল্যেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ মেরে খাওয়ার জন্য মানুষখেকো হিসেবে ব্যপকভাবে পরিচিত। মানুষের বাসস্থানের সীমানার কাছাকাছি থাকা একমাত্র বাঘ নয় এরা। বাঘের অভায়ারণ্যে চারপাশ ঘেরা বান্ধবগড়ে, মানুষের উপর আক্রমণ বিরল। নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ায় ভারতীয় অংশের সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে একটিও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশের সুন্দরবনে অনেক বেশি বাঘ মানুষের হাতে মারা যায়।

বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য স্থানীয়লোকজন ও সরকারীভাবে দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। সুন্দরবনে নিরাপদ বিচরণের জন্য প্রার্থণা করাও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে জরুরি। বাঘের আক্রমনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য জেলে এবং কাঠুরেরা মাথার পেছনে মুখোশ পড়ে বাঘ যেহেতু সব সময় পেছন থেকে আক্রমন করে। এব্যবস্থা স্বল্পসময়ের জন্য কাজ করলেও পরে বাঘ একৌশল বুঝে ফেলে এবং আবারও আক্রমণ হতে থাকে। সরকারি কর্মকর্তারা আমেরিকান ফুটবল খেলোয়াড়দের প্যাডের মত শক্ত প্যাড পরেন যা গলার পেছনের অংশ ঢেকে রাখে। এব্যবস্থা করা হয় শিরদাঁড়ায় বাঘের কামড় প্রতিরোধ করার জন্য যা তাদের পছন্দের আক্রমণ কৌশল।

 

মৎস্যসম্পদ

সুন্দরবনের মাছের ওপর বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি। ফলে মাছের বর্তমান অবস্থা বিলুপ্ত , বিলুপ্তপ্রায় মাছের ওপর উপাত্তনির্ভর তথ্য পাওয়া যায় না। শুধু মানুষ যেসব মাছ খায় এবং যেসব মাছ রপ্তানি উপযোগী, সেসব মাছ চিহ্নিত করা হয়েছে। ধারণা করা হয় যে, সুন্দরবনে শিরদাঁড়াওয়ালা মাছ রয়েছে প্রায় ৩০০ প্রজাতির। সুন্দরবনে মৎস্যসম্পদকে দুইভাগে ভাগ করা হয়। সবমাছ মিলিয়ে হয় সাদামাছ, বাকিরা বাগদা, গলদা। আশির দশকে চিংড়ির পোনা ধরা শুরু হওয়ার পর মাছের প্রাচুর্য হঠাৎ কমে যায়। একসময় স্থানীয়লোকজনের প্রাণিজপ্রোটিন ৮০ শতাংশ মেটাতো মাছ। এখন মাছের পরিমান কমে যাওয়ায় স্থানীয়লোকজনের সবার ভাগ্যে মাছ জোটেনা। সুন্দরবনে ঠুঁটিকামট, কালাহাঙর, ইলশাকামট পাওয়া যায়। আগে এদের খালিশপুর এলাকা পর্যন্ত পাওয়া যেতো, এখন অনেক দক্ষিণে সরে গেছে। পশ্চিম সুন্দরবনে এইসব মাছ পাওয়া যায়। এরা সংখ্যায় অনেক কমে গেছে, কালা হাঙর প্রায় দেখাই যায়না। সুন্দরবনের সবচেয়ে পরিচিত মাছ পারশেমাছ। পারশেরই জাতভাই বাটাভাঙান। ভাঙান, গুলবাটা, খরুলভাঙান আজকাল খুবকম ধরা পড়ে। খরশুলাবাখল্লা অত্যন্ত সুস্বাদুমাছ, মাছটি এইবনে পাওয়াযায়। সুন্দরবনে বিভিন্ন পদ্ধতিতে মাছধরা হয়। ঠেলাজাল, রকেটজালের ছিদ্র খুব ছোট হওয়ায় চারামাছ এবং মাছেরডিম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুন্দরবন এলাকয় জেলে বাড়ায় মৎস্যসম্পদ দ্রুত কমে যাচ্ছে।

 

অর্থনীতি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুনরবন গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। এটি দেশের বনজসম্পদের মধ্যে অন্যতম। সুন্দরবন কাঠের উপর নির্ভরশীল শিল্পে কাঁচামাল জোগান দেয়। এবনথেকেনিয়মিতব্যাপকভাবেআহরণকরাহয়ঘরছাওয়ারপাতা, মধু, মৌচাকেরমোম, মাছ, কাঁকড়াএবংশামুক-ঝিনুক। এছাড়াও সুন্দরবন আমাদেরকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করে এবং, পুষ্টি উৎপাদক, পলি সঞ্চয়কারী, উপকূল স্থিতিকারী, শক্তি সম্পদের আধার। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের মধ্যে অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে। এই বন প্রচুর প্রতিরোধমূলক ও উৎপাদনমূলক ভূমিকা পালনকরে। উৎপাদনমূখী ভূমিকার পাশাপাশি সুন্দরবন, ঘূর্ণিঝড়প্রবণ বাংলাদেশের উপকূলবর্তী জনসংখ্যা ও তাদের সম্পদের প্রাকৃতিক নিরাপত্তা বলয় হিসেবে ভূমিকা রাখে।

 

দর্শনীয় স্থান

এখানে অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্র, হাড়বারিয়া ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র, হিরণপয়েন্ট, দুবলারচর, শরণখোলা, ছালকাটা, টাইগারপয়েন্ট টাওয়ার, টাইগারপয়েন্ট, জামতলাসি-বিচ, সাতনদীর মুখ, কালীরচর উল্লেখযোগ্য।

 

ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

প্রতি বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে এপ্রিল পর্যন্ত সুন্দরবন ভ্রমণের উত্তম সময়। তবে বছরের যেকোনো সময়েও ভ্রমণে যাওয়া যায়।

প্রবেশ ফি

সুন্দরবনে পর্যটকদের প্রবেশ ফিপ্রতিদিনের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা। তবে বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৭০০ টাকা। প্রতিলঞ্চ ২৫০০ টাকা ও ছোট লঞ্চের জন্য কম রয়েছে। ভিডিও ক্যামেরা থাকলে অতিরিক্ত একশ’ টাকা দিতেহয়।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সরাসরি খুলনা পর্যন্ত বাসে বা ট্রেনে যাওয়া যায়। ভোরে খুলনা পৌঁছে ঐদিন শহরের হোটেলে থেকে পরদিন অথবা সেদিনই জেলখানাঘাট বা চার নম্বর ঘাট থেকে শিপে উঠে সুন্দরবন যাওয়া যায়। এছাড়াও ঢাকা থেকে বিমানে যশোর গিয়ে সেখান থেকে সড়ক পথে খুলনা বা মোংলা সমুদ্রবন্দর হতে শিপে চড়েও সুন্দরবন যাওয়া যায়। তবে ভ্রমণের আগে ট্যুরিস্ট শিপের সাথে যোগাযোগ করে যাওয়া ভালো।

 

কোথায় থাকবেন শহরে

খুলনা শহরে রাতে থাকার জন্য বেশকিছু ভালোমানের আবাসিক হোটেল রয়েছে যার মধ্যে হোটেল ক্যাসেল সালাম,  হোটেল সিটি ইন ও হোটেল রয়্যাল উল্লেখযোগ্য।

Leave a Reply